কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই কম্পিউটিংয়ের ক্রমবর্ধমান চাহিদাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ তিন প্রান্তিক পর বড় ধরনের প্রবৃদ্ধির পথে রয়েছে বিশ্বের শীর্ষ চিপ সরঞ্জাম নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) এ খাতের কোম্পানিগুলোর আয় ১৬ শতাংশ বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস পাওয়া গেছে। খবর নিক্কেই এশিয়া।
বাজার পর্যবেক্ষকরা বলছেন, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপভিত্তিক নয়টি শীর্ষ চিপ সরঞ্জাম সরবরাহকারীর জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকের আয় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় গড়ে ১৬ শতাংশ বাড়তে পারে। আগের প্রান্তিকে আয় বৃদ্ধির হার ছিল ৮ শতাংশ। সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর প্রাক্কলন ও ডেটা প্লাটফর্ম কুইক ফ্যাক্টসেটের বিশ্লেষকদের জরিপ থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
প্রতিবেদন আরো বলছে, একই সঙ্গে চলতি প্রান্তিকে প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মিলিত নিট মুনাফা ২০ শতাংশ বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে টানা অষ্টম প্রান্তিকের মতো চিপ সরঞ্জাম নির্মাতাদের মুনাফা দুই অংকের ঘর স্পর্শ করতে যাচ্ছে। উল্লেখ্য, এর আগের তিন মাসে এ মুনাফা বৃদ্ধির হার ছিল ২৬ শতাংশ।
বিশ্লেষকদের মতে, এ প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হলো চিপ নির্মাতাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি। গত জানুয়ারিতে বিশ্বের বৃহত্তম চিপ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোং (টিএসএমসি) ঘোষণা করেছে, ২০২৬ সালে প্রতিষ্ঠানটি মূলধনি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নতুন রেকর্ড গড়তে যাচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়ার এসকে হাইনিক্স ও স্যামসাং ইলেকট্রনিকসও চলতি বছরে নিজেদের বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে।
অন্যদিকে, বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত চিপ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ‘এক্সট্রিম আল্ট্রাভায়োলেট’ (ইইউভি) লিথোগ্রাফি যন্ত্র সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এএসএমএল হোল্ডিং বড় ধরনের অগ্রগতির আভাস দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি আশা করছে, জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকের আয় প্রায় ১০ শতাংশ বাড়বে।
আয়-ব্যয়-সংক্রান্ত এক সভায় গত জানুয়ারিতে এএসএমএলের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ক্রিস্টোফ ফুকে বলেন, ‘গত কয়েক মাসে বাজারের সামগ্রিক পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে।’ বিশ্বজুড়ে চিপের চাহিদা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে তিনি এ ইতিবাচক পূর্বাভাস দেন।
সেমিকন্ডাক্টরের বৈশ্বিক চাহিদা বর্তমানে প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বেশি। বিশেষ করে এআই সার্ভারের জন্য প্রয়োজনীয় ‘ডিআরএএম’ মেমোরি চিপের ক্ষেত্রে এ চাহিদা এখন আকাশচুম্বী।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ উচ্চ চাহিদা মেটাতে চিপ নির্মাতারা এখন উৎপাদন দ্রুত বাড়ানোর জন্য মরিয়া হয়ে কাজ করছেন। অনেক গ্রাহক নতুন কারখানা বা উৎপাদন লাইন চালু করার দীর্ঘ সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারছেন না। ফলে তারা বিদ্যমান যন্ত্রপাতি সংস্কার করেই কাজ চালিয়ে নিচ্ছেন। গ্রাহকদের এ প্রবণতা টোকিও ইলেকট্রনের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবসার বিক্রয় বাড়াতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখছে।
‘ফ্রন্ট-এন্ড’ যন্ত্রপাতির বৈশ্বিক বাজার চলতি বছর ২০ শতাংশের ঘরে পৌঁছবে বলে আশা করছেন সরবরাহকারীরা। এসব যন্ত্রপাতি দিয়ে সিলিকন ওয়েফারের ওপর চিপের সূক্ষ্ম সার্কিট নকশা তৈরি করা হয়। এক্ষেত্রে মূলত ডিআরএএম চিপ তৈরির সরঞ্জামই হবে এ প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি। পাশাপাশি এআই অ্যাপ্লিকেশনে ব্যবহৃত ‘লজিক চিপ’ তৈরির যন্ত্রপাতির বাজারও বেশ শক্তিশালী থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, ফ্রন্ট-এন্ড সরঞ্জাম সরবরাহকারী শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এএসএমএল এবং টোকিও ইলেকট্রন অন্যতম।
প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ আছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান বাণিজ্য ও প্রযুক্তিগত টানাপড়েন সত্ত্বেও চীনে চিপ তৈরির সরঞ্জাম বিক্রি ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। সর্বশেষ প্রান্তিকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আটটি বড় প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত আয় চীনা বাজার থেকে ৮ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ২০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। এসব কোম্পানির মোট বিক্রির ৩০ শতাংশেরও বেশি আসছে চীন থেকে।
এএসএমএলের সরঞ্জাম বিক্রির হার চীনে প্রায় ৬০ শতাংশ বেড়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, রফতানি নিষেধাজ্ঞার আওতামুক্ত পুরনো প্রজন্মের লিথোগ্রাফি সরঞ্জামগুলোর উচ্চ চাহিদাই এ প্রবৃদ্ধির কারণ। এছাড়া চিপ প্রসেসিং ও টেস্টিংয়ের জন্য ব্যবহৃত ‘ব্যাক-এন্ড’ সরঞ্জাম নির্মাতা অ্যাডভান্টেস্ট এবং ডিস্কোর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট বিক্রির ২০-৩০ শতাংশই আসছে চীনা বাজার থেকে।